বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) বা রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও)-এর কোনো সম্পর্ক নেই। আরাকান আর্মির রাজনৈতিক শাখা ইউনাইটেড লীগ অব আরাকান (ইউএলএ) সম্প্রতি যে অভিযোগ তুলেছে, সেটিকে বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যা দিয়েছে বিজিবি। তারা বলেছে, আরসা কিংবা আরএসও-কে সমর্থন করার প্রশ্নই ওঠে না। বরং এ ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে ধারাবাহিকভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে।
সোমবার এক বিবৃতিতে বিজিবি জানায়, শীর্ষ নেতা আতাউল্লাহ জুনুনিসহ একাধিক আরসা সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় তাদের কথিত কার্যকলাপ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে বিজিবি কোনোভাবেই এ গোষ্ঠীগুলোকে মিত্র হিসেবে দেখে না। বরং সীমান্তে যে কোনো অননুমোদিত সশস্ত্র উপস্থিতি নির্মূল করতে বিজিবি কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইউএলএর অভিযোগ আসলে নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্যাতন ও অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ড আড়াল করার কৌশল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বাস্তবতা স্বীকার করার আহ্বান জানিয়ে বিজিবি অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে।
বিজিবি জানায়, জাতীয় সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার চাপ মোকাবিলা করাই তাদের দায়িত্ব। ২০২৩ সালের শেষ দিকে মিয়ানমারে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সীমান্তে বিশেষ নজরদারি শুরু হয়েছে। নাফ নদী ও পার্বত্য সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে। ঘুমধুম ও বান্দরবান-কক্সবাজার সীমান্তে সর্বত্র সৈন্য মোতায়েন রয়েছে, যারা পালাক্রমে টহল দিচ্ছে। অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের ফলে চোরাচালান ও জঙ্গি অনুপ্রবেশ ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে।
বিজিবি আরও জানায়, ইউএলএ যখন দোষারোপ করছে, তখন নিজেরাই মারাত্মক সংকটে আছে। আরাকান আর্মির (এএ) অভ্যন্তরে মাদক বাণিজ্য, সম্পদ লুণ্ঠন, মানসিক ক্লান্তি ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে যোদ্ধাদের মনোবল ভেঙে পড়েছে। নতুন সদস্য সংগ্রহে নানা নৃগোষ্ঠীকে যুক্ত করলেও ভাষাগত বাধা ও স্থানীয় ভূখণ্ড সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তাদের কার্যকারিতা কমে গেছে। খাদ্যসংকটও পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। ফলে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সীমান্তে ঢোকার চেষ্টা করছে।
এ প্রসঙ্গে বিজিবি উল্লেখ করে, সম্প্রতি আরাকান আর্মির একজন লেফটেন্যান্ট বাংলাদেশের ভেতরে আত্মসমর্পণ করেছে, যা তাদের দুর্বলতারই প্রমাণ। শুধু রোহিঙ্গারা নয়, ম্রো ও তানচঙ্গ্যার মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং এমনকি রাখাইন সম্প্রদায়ের অনেক মানুষও এএ’র নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। অনেকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
বিজিবি আরও বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে তারা আরসা ও আরএসও-র বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। নাফ এলাকায় তাদের চাঁদাবাজি ও মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, এসব জঙ্গি বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে নয়, মিয়ানমার থেকেই অনুপ্রবেশ করে। সীমান্তে আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনই প্রমাণ করে, এসব কার্যক্রম বাংলাদেশের ভেতর থেকে নয় বরং মিয়ানমারের ভেতর থেকেই পরিচালিত।
বিজিবি জোর দিয়ে বলেছে, দেশের স্বার্থ রক্ষায় তারা সর্বদা অটল। মানবিক সুরক্ষা, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্তের নিরাপত্তাই তাদের মূল লক্ষ্য। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়ে বিজিবি বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সহিংসতা বা চরমপন্থার মাধ্যমে নয়, বরং কূটনীতি ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমেই সীমান্তের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, রূপান্তর প্রতিদিন এর দায়ভার নেবে না।