জাফলংয়ের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আরেকটি অনন্য আকর্ষণ হলো এখানকার খাসিয়াপুঞ্জি। পান-সুপারি ও ফলের বাগান ঘেরা এই পুঞ্জিগুলো শুধু খাসিয়াদের জীবনধারাই নয়, বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানের এক জীবন্ত নিদর্শন।
একসময় এসব পুঞ্জিতে শুধুই খাসিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করলেও বর্তমানে এখানে বাস করছেন মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও। বিশেষ করে ‘নতুন সংগ্রামপুঞ্জি’ নামের একটি গ্রামে এই সহাবস্থানের চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। এই সহাবস্থানের মূল কারিগর হলেন নেরুলা থেংসন, যাকে সবাই সম্মান দিয়ে ‘জমিদার’ বলে ডাকেন।
খাসিয়া সম্প্রদায় মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অনুসারী। যদিও বাংলাদেশে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত, তথাপি খাসিয়াদের মধ্যে এখনও প্রথাগত জমিদারি সংস্কৃতি টিকে রয়েছে। বিশাল সম্পত্তির মালিক হওয়ায় নেরুলা থেংসনকে পুঞ্জিবাসীরা জমিদার হিসেবে মানেন এবং তার কথাই শেষ কথা হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রায় ৩০০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে নতুন সংগ্রামপুঞ্জি ও আজমেরি বস্তি, যেগুলো গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী পিয়াইন ও ডাউকি নদীর জিরো পয়েন্টে অবস্থিত। এসব এলাকার নদীঘেঁষা জমি বালু-পাথর লুটপাটের সময় পুঞ্জিবাসীরা নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন—যা তাদের সচেতনতার পরিচয় বহন করে।
বর্তমানে নেরুলার দায়িত্বে আছেন তার ভাগনে স্টালিন তারিয়ান, যিনি একসময় স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি জানান, পুঞ্জির সুপারির আয় বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা, এছাড়া পান ও অন্যান্য ফসল থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হয়। যারা এখানে কাজ করেন, তাদের নির্ধারিত মজুরি দেওয়া হয়।
সংগ্রামপুঞ্জিতে বর্তমানে বসবাস করছেন ৪৫টি খ্রিস্টান, ৯৩টি মুসলিম ও ৭৫টি হিন্দু পরিবার। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে তারা সবাই একসাথে বসবাস করছেন। ইউপি সদস্য কামাল উদ্দিন জানান, জমিদার নেরুলা সকল ধর্মের মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন—কোরবানির পশু, পূজার অনুদান থেকে শুরু করে ঘর নির্মাণ পর্যন্ত।
এই পুঞ্জি শুধু সিলেট নয়, বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য মডেল—যেখানে ঐতিহ্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান একসাথে বেড়ে উঠছে নেরুলা থেংসনের নেতৃত্বে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, রূপান্তর প্রতিদিন এর দায়ভার নেবে না।